দেশের শিল্প খাতের ৮০ শতাংশ কারখানাই এখন লোকসানে চলছে। অথচ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের (এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন) কথা রয়েছে বাংলাদেশের। তবে সরকার এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে গেলেও ব্যবসায়ীরা যাবেন না বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর গুলশানে গতকাল ‘ব্যবসায়িক পরিবেশ: সংস্কার, সুযোগ ও সামনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তারা। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ইংরেজি দৈনিক দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস।
বৈঠকে প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘সরকার এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যাচ্ছে কিনা জানি না। তবে আমরা প্রাইভেট সেক্টরে যারা আছি তারা যাব না।’ এক্ষেত্রে সরকার ও ব্যবসায়ীদের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
দেশের শিল্প ও অর্থনীতি আইসিইউতে রয়েছে—উল্লেখ করে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘৮০ শতাংশ কারখানাই লোকসানে চলছে। আমরা শুরু থেকেই এ সরকারকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দেয়ার জন্য বলে আসছি। সবার কথা শুনে মনে হয়েছিল, তারা (সরকার) এটা পিছিয়ে দেয়ার বিষয়ে মত দিয়েছে। কিন্তু সরকার হঠাৎ করে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, আমরা পিছিয়ে দিলে বন্ধুরাষ্ট্রগুলো বিরোধিতা করবে।’
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের অনুরোধ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর জন্য আবেদন করুন। এরপর জাতিসংঘকে বলুন, তারা এসে প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করুক। তারা যদি পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে মনে করে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যাওয়ার মতো, তাহলে আমরা যাব। আমার বিশ্বাস, জাতিসংঘ এসে তদন্ত করলে বলবে, আগামী ১০ বছরেও গ্র্যাজুয়েশনে যাওয়ার মতো পরিবেশ বাংলাদেশে নেই।’
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘সরকার বলে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আসছে না। অথচ এফডিআই আসার মতো পরিবেশ আমরা দেখি না।’
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘যে দেশের বিমানবন্দর আগুনে পুড়ে যায়, সেখানে কারা বিনিয়োগ করতে আসবে? বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আনতে সরকার নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু দেশের বিনিয়োগকারীরা শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিদেশীরা আসার আগে দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একটু হলেও আলাপ করে। তারা আমাদের দেখে পরিস্থিতি মূল্যায়নের চেষ্টা করেন। দেশের সুনাম বাঁচাতে আমরাও তাদের মিথ্যা বলে সবকিছু ভালো—এটি বোঝাই। কিন্তু এভাবে আর কতদিন?’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। এ সময় দেশে ব্যবসার পরিবেশ নেই—ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশের সবকিছু কেমন চলছে এ প্রশ্ন আগে ১০০ জনকে জিজ্ঞেস করলে ৯৯ জনই বলত এটি কাজ করছে না। একজন বলত ঠিক আছে। এখন হয়তো পাঁচজন বলছে ঠিক আছে। আমরা কি এখন বলব চার গুণ ঠিক করে দিয়েছি? নাকি বলব ৯৮ শতাংশ এখনো অসন্তুষ্ট। দুটোই সত্যি। আমরা কোথা থেকে শুরু করেছি, সেটাও কিন্তু দেখা উচিত। নানা ক্রাইসিসের মধ্যে এ সরকার কাজ শুরু করেছে।’
লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ‘বৈশ্বিক অস্থিরতা চলছে। এখন কেউ যদি বলে ব্যবসা নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাব, কোন দেশে যাবেন? বৈশ্বিক অস্থিরতা এখন উচ্চপর্যায়ে। আমাদের বিপ্লব হয়ে গেছে, ভিয়েতনামে এখনো বাকি আছে। ফ্রান্সে গত তিন বছরে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। আমরা সরকারে আসার পর থাইল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছে। জাপানে দুইবার হয়েছে। নেপালেও হয়েছে। আমাদের জন্য ইউএসএআইডি বন্ধ হয়েছে, এরপর ট্রাম্পের ট্যারিফ এসেছে।’
বিপ্লব-পরবর্তী কোনো দেশে এত দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমে আসে না দাবি করে তিনি বলেন, ‘শ্রীলংকার দিকে তাকালে দেখবেন প্রথম বছর তাদের মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৫ শতাংশ, পরের বছর ছিল ২০ শতাংশ। এর পরের বছর আরো কমেছে।’
দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী শামসুল হক জাহিদের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) উপচেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ। এ সময় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ হাসনাত আলম।
দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস অনলাইন ও ডিজিটাল কনটেন্ট প্রধান শিহাবুর রহমান শিহাবের সঞ্চালনায় বৈঠকে আলোচক হিসেবে ছিলেন বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান, বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান, ইউসিবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরীফ জহির, মিডল্যান্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান-উজ জামান, বাংলাদেশ-থাই চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিটিসিসিআই) সভাপতি শামস মাহমুদ, বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি মইনুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক কাকলী জাহান আহমেদ, বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান, আইসিএবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শুভাশীষ বসু, আকিজ বশির গ্রুপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আখতার মালা।